আপনার পরিবারের সদস্যদের কিডনি কি সুরক্ষিত?

কিডনির রোগ যেমন জটিল, তেমনি এর চিকিৎসাও ব্যয়বহুল। দীর্ঘমেয়াদি কিডনি অকার্যকারিতায় শেষ অবধি ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। আমাদের দেশে এই দুটো চিকিৎসাই সাধারণের সামর্থ্য ও আয়ত্তের বাইরে। অথচ সচেতন থাকলে কিডনির অনেক রোগ ও জটিলতাকেই এড়ানো সম্ভব।

কিডনি কেবল শরীরের র’ক্ত শোধন বা বর্জ্য নিষ্কাশনই করে না; র’ক্তকণিকা তৈরি, হাড়ের সুস্থতা, র’ক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, পানি ও লবণের ভারসাম্য রক্ষাসহ আরও নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। তাই কিডনি নষ্ট হয়ে গেলে এই সবকিছুর ওপরই প্রভাব পড়ে। কিডনি বিকল হওয়ার প্রধান কারণগুলো হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ র’ক্তচাপ, প্রদাহ বা গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস—যা ছোটদেরও হতে পারে, পাথর, ক্যানসার ইত্যাদি, তার সঙ্গে নানা ওষুধ ও রাসায়নিকের বিষক্রিয়া।

একটু সচেতন থাকলেই আমরা এসব থেকে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ প্রতিরোধ করতে পারি।

এক. অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ র’ক্তচাপ কিডনি বিকল করে। পরিবারে যাঁদের বয়স ৪০ পেরিয়েছে, তাঁরা নিয়মিত র’ক্তচাপ মাপুন, বেশি থাকলে ওষুধ গ্রহণ করুন। পাতে লবণ একেবারেই নিষেধ। র’ক্তচাপ একটু বেশি থাকলে কিছু হয় না বা সমস্যা না হলে ওষুধ খাবার দরকার নেই—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসুন। বয়স্করা অনেক সময় ওষুধ খেতে ভুলে যান, বা র’ক্তচাপ বাড়লেও বুঝতে পারেন না। তাঁদের দিকে বিশেষ নজর দিন।

দুই. বাংলাদেশে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস কিডনি বিকল হওয়ার প্রধানতম কারণ। র’ক্তে শর্করা কাঙ্ক্ষিত মাত্রার নিচে রাখতেই হবে। নিয়মিত র’ক্তের শর্করা মাপুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। যাঁদের ডায়াবেটিস আছে, তাঁরা বছরে অন্তত এক বা দুবার কিডনি পরীক্ষা করাবেন। মনে রাখবেন, ডায়াবেটিস যে কারও হতে পারে। অল্প বয়সেও যে হবে না, তা কে জানে। পিপাসা, প্রস্রাব বেশি হওয়া, ওজন হ্রাস, ক্লান্তি—এসব হলো লক্ষণ। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের হার বাড়ছে। তাই বাড়ির মেয়েদের এই সময়টাতে খেয়াল রাখুন, শর্করা মাপা হয়েছে কি না।

তিন. স্থূলতার সঙ্গেও কিডনি রোগের সম্পর্ক আছে। এ বছরের কিডনি দিবসের প্রতিপাদ্যই হচ্ছে অধিক ওজন ও কিডনি রোগ। দেখা গেছে কিডনিতে পাথর, ক্যানসার ও দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের সঙ্গে স্থূলতা জড়িত। এ ছাড়া ওজন বাড়লে ডায়াবেটিস ও উচ্চ র’ক্তচাপের ঝুঁকিও বাড়ে। তাই নিয়মিত ব্যায়াম করুন। ওজন কমান। এতে অন্যান্য রোগের মতো কিডনি রোগের ঝুঁকিও কমবে।

চার. যখন-তখন ইচ্ছে হলেই দোকান থেকে কিনে ওষুধ খাবেন না। অনেক ওষুধ আছে যা কিডনির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অনেক ওষুধ মাত্রাতিরিক্ত হলে কিডনির সমস্যা হতে পারে। না জেনে বনাজি, হারবাল ওষুধ, অতিরিক্ত ভিটামিন ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্টও ক্ষতিকর হতে পারে। শিশুদের যেকোনো ওষুধে খুবই সাবধানতা জরুরি। মাত্রার একটু এদিক-ওদিক হতে পারে বিরাট বিপত্তি। তাই সাবধান, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ কখনো নয়।

পাঁচ. ধূমপান কিডনিতে র’ক্ত চলাচল ব্যাহত করে। এ ছাড়া কিডনি ক্যানসারেরও ঝুঁকি বাড়ায়। ধূমপান একেবারেই বর্জন করুন। শিশু ও নারীরা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। তাই সবার সুরক্ষার জন্যই ধূমপান ছাড়াটা জরুরি।

ছয়. পরিবারে সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন। প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল খেতে হবে। লাল মাংস কম খান। পানি বেশি খেলে কিডনি ভালো থাকবে এমন কোনো কথা নেই। তবে আবহাওয়া অনুযায়ী যথেষ্ট পানি পান করুন। শিশুরা স্কুলে ঠিকমতো পানি পান করে কি না খেয়াল করুন। প্রস্রাব আটকে রাখা খারাপ। প্রস্রাবে সংক্রমণ এড়াতে ব্যক্তিগত ও টয়লেটের পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দিন।

সাত. বয়স বাড়লে, বিশেষত উচ্চ র’ক্তচাপ ও ডায়াবেটিস থাকলে, প্রতিবছর নিয়ম করে কিডনির সুস্থতা জানতে প্রস্রাবে আমিষ ও প্রয়োজনে অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান। কোনো ব্যতিক্রম লক্ষ করলে সতর্ক হোন। ছোটদেরও কিডনিতে প্রদাহ হয়। প্রস্রাব কম হওয়া, লাল হওয়া ও শরীরে পানি জমা এর লক্ষণ। এমন হলে চিকিৎসা নিতে দেরি করবেন না।

Leave your vote

Comments

0 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *