‘এই সম্পর্ক আমাদের জন্য ভালো হবে না’

প্রেমে পড়তে নিষেধ নেই। ভালোবাসা কোনো কিছু মানে না। মানমর্যাদা, সামাজিকতার বিধিনিষেধ পেরিয়ে প্রেমের জয়জয়কার। জয়ধ্বনি তুলতে তুলতে হঠাৎ যদি প্রেমের ফোলানো বেলুনটি আলপিনের খোঁচায় চুপসে যায়, তখন কী হবে! প্রেমের এত সুর আর এত গান যদি ভালো না লাগে তখন কী করা?

ভালো লাগা মানে হচ্ছে, রাস্তা থেকে পছন্দ হলে সেই ফুলটি ছিঁড়ে নেওয়া! শুকিয়ে গেলে বা গন্ধ চলে গেলে তা ছুড়ে ফেলা! আর ভালোবাসা হচ্ছে ফুলগাছটির পরিচর্যা করা। প্রেম থাকবে সারা জীবন। তাই এর সঠিক পরিচর্যা করা প্রয়োজন জীবনভর। একে টিকিয়ে রাখতে চাইলে চাই উভয় পক্ষের সমঝোতা। যত ঝড়ঝাপটা আসুক না কেন, কেউ তাতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। অস্থিরতা, লোভ, লাভক্ষতির হিসাবনিকাশ করলে প্রেম থাকে না।

1
2
3

অনার কিলিং প্রথা আমাদের দেশে চালু নয়। কিন্তু সে রকম পারিবারিক, সামাজিক টানাপোড়েন কিন্তু অস্বীকার করা যায় না। ঝাঁজ ও ঝকমারিও বেশ রয়েছে।
একজন ১৮-১৯ বছর বয়সী মেয়ে এল। সঙ্গে তার মা। মেয়েটি রাগে মরে যেতে চাইছে। কারণ, ওর সহপাঠীর সঙ্গে এক বছর ধরে সম্পর্ক চলছিল। এটা জানার পর থেকে ছেলেটির মা ওকে ফোনে বিভিন্নভাবে তাঁর ছেলে থেকে দূরে থাকতে বলছিলেন। মেয়েটি যত দূর পারে এড়িয়ে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে মেয়েটি ভদ্রমহিলাকে জানায়, তার মাদকাসক্ত ছেলেটিই পিছু ছাড়ছে না। তখন ছেলেটির মা তাকে যা নয় তা বলে। টিনএজ মেয়েটি গালাগাল ও নোংরা কথার উত্তর দিতে পারেনি। এখন সে অপমানের জ্বালা সইতে পারছে না।

4
5
6

আগে ভাবলে পরে পস্তাতে হবে না

* প্রেমে যে পড়েছেন তার গন্তব্য কী? ‘টাইম পাস’ না সারা জীবনের জন্য গাঁটছড়া বাঁধার ইচ্ছা।

* যে সময় দুজন একসঙ্গে কাটালেন, এই সময়ে দুজনার মতের মিল-অমিল কতখানি মেপে নিন।

* একজনের পছন্দ-অপছন্দ অন্যজনের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা কতখানি। বুঝে নিন।

* প্রেমে পড়লেই তো চলে না। এর পেছনে খরচও আছে। খরচ চালানো বড় একটা ব্যাপার বটে। মেয়েটি ভাবে, ছেলেটি সব সময় কিছু না কিছু খাওয়াবে, যাতায়াতের খরচ বহন করবে। কিন্তু ছেলেটি যদি ছাত্র হয়, তবে তাকে মা-বাবার পকেট কেটেই চলতে হয়।

7
8
9

* আবার এমনও দেখা গেছে, মেয়েটি ছেলেটির টিউশন ফি থেকে শুরু করে বাদাম খাওয়ার খরচ পর্যন্ত দিচ্ছে। আর জন্মদিন, ভালোবাসা দিবস, বন্ধু দিবস, প্রথম দেখার দিন—কত কিছুই না তালিকায় আছে। প্রেমে শত ঝকমারি। খরচের ক্ষেত্রে কার হাতখোলা, কে কৃপণ, কে প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে; কে কতখানি বন্ধুবৎসল বুঝতে হবে।

* সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরস্পরের পরিবারের সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

* পেশাজীবন নিয়ে কে কী ভাবছেন, তা দুজনের কাছে পরিষ্কার থাকা উচিত।

* প্রেমের মধুর দিনগুলোয় সজাগ থাকাই ভালো। গড্ডলিকায় ভেসে যাওয়া চলবে না।

10
11
12

* আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে বাস্তবতাকে মেনে নিতে মানসিক প্রস্তুতি যেন থাকে।

* ভুলেও ফাঁদে পড়া চলবে না। সুখের মুহূর্তগুলো ভাগাভাগি করুন। কিন্তু একান্ত মুহূর্তগুলো দাম্পত্য জীবনের জন্য রাখাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

* সেলফি নিষেধ নয়। সুন্দর প্রেমের মুহূর্ত স্মৃতিছবির ফ্রেমে থাকুক—সেটা সবার কাম্য। কিন্তু সেই ফ্রেমে আপত্তিকর যেকোনো সম্পর্ক একদম এড়িয়ে চলা উচিত।

* ক্ষণিকের আবেগের জোয়ারে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের নানা ছবি সৃষ্টি হয়ে যায়। কিন্তু ব্ল্যাকমেলিংয়ের শিকার হতে পারেন—এমন আশঙ্কা মনে রাখতেই হবে।

* ভিডিও বা ফটো ব্ল্যাকমেলিং এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। সাবধানতা কাম্য। কোনোভাবেই নিরাপদ ও সহজ স্বাভাবিক প্রেম-বন্ধুতার বেশি চাওয়া পাওয়ায় জড়ানো ঠিক নয়।

* ডেটিংয়ের নামে অচেনা কোনো জায়গা, হোটেল, বন্ধুর বাসা নিরাপদ নয়।

* জীবন থেকে পলায়ন প্রেম নয়; প্রেমে পড়ে দূরে কোথাও কোনো হারিয়ে যাওয়া বা পালিয়ে যাওয়া ঠিক নয়।

* প্রেমে পড়াকে দুর্ঘটনা ভাবলে চলবে না। ভুল প্রেম থেকে ফিরে আসার সাবধানতা থাকতে হবে। আপসে মুক্তির বা বিচ্ছেদের পথ যেন খোলা থাকে।

* প্রেমের আবেগে পরিবারকে ভুললে চলবে না; বরং বিষয়টি নিয়ে সামাজিক, পারিবারিক মোড়কে সমাধানের উদ্যোগ থাকলে সেটা রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
* সারা জীবনের জন্য দুর্গতি ও কান্না কি না—প্রেমের পর্বে মনে রাখা চাই।

* প্রেম ছেলেখেলা বা টাইম পাস নয়। প্রেম হলো একটি সম্ভাবনাময় সুখের সংসারের ভিত্তি।

কীভাবে সরে আসবেন

মনোরোগবিদেরা এমন সমস্যার কাউন্সেলিংয়ে যে বিষয়ে গুরুত্ব দেন, তা হলো হুট করে রাগারাগির বশে; মাথা গরম করে সম্পর্ক ভাঙতে নেই। সেটা প্রচুর পার্শ্ব সমস্যার সৃষ্টি করে।

* দুয়ে দুয়ে চার না হলে মুশকিল। সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়। অযথা ঝগড়া করে লোক হাসিয়ে সময় নষ্ট করে লাভ নেই।

* সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলো অনুভব করছেন, তা মনের মধ্যে পুষে রেখে বা চাপা দিয়ে কোনো লাভ নেই। এতে দুজনার সুসম্পর্কের মুহূর্তগুলো হারিয়ে যাবে। তিক্ততার সম্পর্ক বাসা বাঁধবে। সময় থাকতে নিজেদের নাখোশ মনোভাব নিজেদের মধ্যে আলোচনা করুন।

* দোষারোপের ভঙ্গিতে নয়। শান্ত ভঙ্গিতে আলাপচারিতাই কাম্য। কেন সরে আসা—তার ব্যাখ্যা ও যুক্তি মাথায় সাজিয়ে সমঝোতামূলক বিচ্ছেদ উত্তম।

* বলতে না পারলে কষ্ট হলে ধীরে ধীরে সম্পর্কের মাধ্যম যেমন ফোন, ফেসবুক থেকে নিজেদের সরিয়ে নিন।

* সরে আসার পর্বে বিশ্বস্ত বন্ধুবান্ধব; সহানুভূতিশীল নিকটাত্মীয়দের পরামর্শ নেওয়া ভালো। তাদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা যেতে পারে। সেটা নানা অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনা ও বিপদকে প্রশমন করবে।

* কার কী ভুল, তা নিয়ে উত্তেজনা, উগ্রতা ও রাগ পরিহার করে আত্মোপলব্ধি ও আত্মমূল্যায়নের সঠিকতা নির্ণয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

* কোনো ধরনের অপরাধমূলক প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেলিংয়ের আশঙ্কা থাকলে সেটা নিয়ে অতি গোপনীয়তার চেয়ে আইনি সুরক্ষা চিন্তা করা যেতে পারে।

আগে-পিছে দেখে চল, কাঁটা ফুটবে পায়ে; চোরকাঁটা হলে পরে তারে তোলা যায়; কিন্তু প্রেমের কাঁটা দুধারী তলোয়ার—কেবল প্রেমকেই বিষায় না, জীবনকেও বিষিয়ে তুলতে পারে। তাই আগাম সাবধানতাই সর্বাত্মক কাম্য।

তারপরও প্রেম কি বাধ মানে?

আড়ালে-আবডালে প্রেম নিয়ে চলে অভিভাবকদের নানা সমীকরণ। ছেলে-মেয়ে একে অপরকে শর্তহীন পছন্দ করলেও উভয় পক্ষের গুরুজন পরস্পরের বিত্তবৈভবের দিকে নজর রাখেন। ছেলের বাড়ির তরফ থেকে উচ্চশিক্ষিত মেয়ে খুব কাম্য নয়।

নরম-শরম গোবেচারা কি না, সেটা বড় কাঙ্ক্ষিত। গাত্রবর্ণ নিয়েও উৎকণ্ঠার শেষ নেই। মেয়ের বাবা-মায়ের তরফে প্রতিষ্ঠিত ছেলে; একনামে চেনে এমন পরিবারই পছন্দ। যখন এই চাওয়াপাওয়াগুলো গোলমেলে হয়, তখনই সামাজিক, পারিবারিক আপত্তির বাজনা বেশি বাজা শুরু হয়।

এত সমস্যা জানার পরেও প্রেমে পড়তে বা করতে মনে মনে সবাই আগ্রহী। প্রেমের রসায়ন প্রথম যৌবনের ঘূর্ণিঝড়। এর ঝাপটা কমবেশি সব প্রাণকেই করে আলোড়িত ও শিহরিত। দিল্লিকা লাড্ডুর মতো।

স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। প্রথম বর্ষ থেকেই প্রেম। মেয়েটি অপেক্ষাকৃত ভালো ছাত্রী। প্রেম বলে কথা। দখল দেখভাল কম নয়। ছেলেটি ক্রমেই মেয়ের চলাফেরা, কার সঙ্গে কথা বলবে কি বলবে না তাতে বাধা দেওয়া শুরু করে। ক্যাম্পাসে সবাই মিলে ছেলেমেয়ে একসঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে, তা মানতে নারাজ প্রেমিকটি। যখন-তখন রাতে ওর মোবাইল ফোনে মিসড কল বা কল দিয়ে চেক করে, মেয়েটির ফোন ব্যস্ত কি না। ব্যস্ত থাকলে ওর বন্ধুদের সামনে বকাঝকা শুরু করে। মেয়েটির বান্ধবীরা ওকে এই সম্পর্ক থেকে সরে আসতে বলেছিল। তারপরও অন্যায় আচরণগুলো সে মেনে নিয়েছিল। একদিন সবার সামনে ওকে ছেলেটি কথায় কথায় চড় মেরে বসে। পুষে রাখা দীর্ঘদিনের রাগ চাপতে না পেরে মেয়েটিও সজোরে চড় মেরে দেয়। শোধবোধ। পেছনে না তাকিয়ে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে আসে সে। তারপর লেখাপড়ায় বেশ বিরতি। ছেলেটি ভয়ভীতি দেখায়—ভয়ংকর কোনো কাণ্ড করবে। হেনস্তা, অপমান করবে বন্ধুদের নিয়ে। উড়োচিঠি দেয়। অন্তরঙ্গ কিছু ছবি, ভিডিও ক্লিপস ফাঁস করার ব্ল্যাকমেলিং করতে শুরু করে।

এমন গল্প আমাদের যাপিত জীবনে কমবেশি চারপাশে সব জায়গায় ঘটছে। মহানগর থেকে মফস্বলের ছোট শহরে।

Leave your vote

Comments

0 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *