in

কোভিডের পরও স্বাদ গন্ধ হারানোর যে রোগ হতে পারে

ক্রিস্টি ব্রিউয়ার, বিবিসি নিউজ

ক্লেয়ার ফ্রির

কোভিড-১৯ বা করোনায় আক্রান্ত হলে অনেকেই স্বাদ বা গন্ধ সাময়িকভাবে হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু যখন তারা সুস্থ হয়ে ওঠেন তখন স্বাভাবিকভাবে আবার মুখের স্বাদ বা গন্ধ তারা ফিরে পান। তবে কিছু ক্ষেত্রে এখন ভিন্ন ঘটনা ঘটতে দেখা যাচ্ছে ।

দেখা যাচ্ছে, খাবার, সাবান বা প্রিয়জনের গায়ের গন্ধ – যার স্বাদ বা গন্ধ আগে তাদের কাছে দারুণ মনে হতো – এর সবকিছুই তীব্রভাবে বিস্বাদ হয়ে পড়ছে। আর এটিকেই বলা হচ্ছে পারোসমিয়া, যাতে আক্রান্ত হবার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যদিও বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন যে কেন এটি হচ্ছে, আর এর সমাধানই বা কী।

ক্লেয়ার ফ্রির তেমনি একজন – যিনি এখন পরিবারের জন্য রান্নার চেষ্টা করলেই সেটি শেষ পর্যন্ত কান্নায় রূপ নিচ্ছে। “গন্ধ আমাকে হতবিহবল করে তোলে। একটি পচা গন্ধে ঘর ভরে যায় এবং এটা অসহ্য,” বলছিলেন তিনি। গত সাত মাস ধরে পারোসমিয়ায় ভুগছেন ৪৭ বছর বয়সী এই নারী।

মেয়ের সাথে ক্লেয়ার

পিঁয়াজ, কফি, মাংস, ফল, অ্যালকোহল, টুথপেস্ট, ক্লিনিং উপকরণ কিংবা পারফিউম – সব কিছুতেই তার বমি ভাব চলে আসে। এমনকি ট্যাপের পানিও, যার ফলে তার জন্য কোন কিছু ধোওয়াটাও কঠিন হয়ে ওঠে। “আমি এমনকি আমার পার্টনারকে আর চুমু পর্যন্ত খেতে পারছিনা,” বলছিলেন তিনি।

গত বছর মার্চে আরও অনেকের মতো ক্লেয়ারও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন, যার ফলে স্বাদ গন্ধ হারিয়েছিলেন তিনি। মে ও জুনের মধ্যে স্বাদ গন্ধ আবার ফিরে এলেও ক্লেয়ারকে তার প্রিয় জিনিসগুলো থেকে দুরে সরে যেতে হয়। কারণ এগুলোর মধ্য থেকে এক ধরণের টক গন্ধ আসছিলো এবং কখনো কিছু চুলায় দিলে মনে হতো এক ধরণের রাসায়নিক গন্ধ আসছে কিংবা অতিরিক্ত পুড়ে যাচ্ছে।

গ্রীষ্মকাল থেকে তিনি বেঁচে আছেন ব্রেড আর চিজ খেয়ে কারণ একমাত্র এগুলোর গন্ধই তিনি সহ্য করতে পারছেন। তিনি বলছেন, “আমার শক্তি বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই”। এটি তাকে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং তিনি বলছেন অধিকাংশ দিনগুলোতে কান্নাই করেন তিনি।

“ঘ্রাণশক্তি ভালো না হলেও আমি জীবন চালাতে পারছিলাম এবং খাওয়া ও পান করা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। পারোসমিয়া থেকে মুক্তি পেলে আমি ওভাবেই চলতে পারতাম,” বলছিলেন তিনি।

ক্রিস্টি ও লরা

ক্লেয়ারের চিকিৎসক বলছেন, তিনি তার এমন পরিস্থিতি আর কখনো দেখেননি। ভীত ও হতভম্ব ক্লেয়ার ঘ্রাণশক্তি হারানো বিষয়ক চ্যারিটি অ্যাবসেন্ট এর মাধ্যমে একটি ফেসবুক গ্রুপ তৈরি করেছেন যার সদস্য প্রায় ছয় হাজার। এদের প্রায় সবাই করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঘ্রাণশক্তি হারিয়েছিলেন এবং পরে পারোসমিয়ায় আক্রান্ত হন।

অ্যাবসেন্ট প্রতিষ্ঠাতা ক্রিসসি কেলি বলছেন বিভিন্ন ধরণের পারোসমিয়া রয়েছে তাদের। অনেক সময় তারা গন্ধ কেমন পাচ্ছেন সেটা বোঝানোও কঠিন হয়ে পড়ে তাদের কাছে। কারণ এর আগে এমন কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় বর্ণনার জন্য যথাযথ শব্দও তারা খুঁজে পান না।

করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের অন্তত ৬৫ ভাগ স্বাদ গন্ধ হারিয়েছেন এবং এদের মধ্যে অন্তত দশ ভাগ হয়তো পারোসমিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন বা ফ্যান্টসমিয়ায় ভুগছেন – অর্থাৎ যা নেই তার গন্ধ পাচ্ছেন। আর এটি সত্যি হলো বিশ্বের অন্তত ৬৫ লাখ মানুষ এখন দীর্ঘমেয়াদী পারোসমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন।

রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ডঃ জেন পার্কার পারোসমিয়া নিয়ে আগে থেকেই পড়াশোনা করছিলেন। অ্যাবসেন্ট পারোসমিয়া ফেসবুক গ্রুপের অনেকের সাথে কাজ করছেন তিনি ও তার টিম। তারা বলছেন কফি, সবজি, ফল, ট্যাপের পানি ও ওয়াইনের পাশাপাশি মাংস, পেঁয়াজ, রসুন বা চকোলেটও খারাপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে।

পার্কারের গবেষণায় পাওয়া গেছে যে খারাপ গন্ধ পারোসমিয়ার সাথে থেকে যেতে পারে অস্বাভাবিক লম্বা সময়ের জন্য। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কফির গন্ধ একজনের মধ্যে অল্প সময় থাকলেও পারোসমিয়ায় আক্রান্তদের মধ্যে এটি থেকে যেতে পারে কয়েক ঘণ্টা, এমনকি কয়েক দিনও।

পারোসমিয়ার সাথে লড়াইয়ের জন্য কয়েকটি টিপস:

• রুম তাপমাত্রার খাবার খান

• ভাজা খাবার, রোস্ট মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, ডিম, কফি, চকোলেট পরিহার করুন

• ভাত, নুডলস, দই, স্বাভাবিক ব্রেড ও স্টিমড ভেজিটেবল চেষ্টা করুন

ইউকে লিড ফর দি গ্লোবাল কনসোর্টিয়াম ফল কেমোসেন্সরি রিসার্চের ব্যারি স্মিথ বলছেন- খারাপটা ভালো এবং ভালোটা খারাপ – এটাই হলো পারোসমিয়ার একটি বৈশিষ্ট্য।

“কিছু লোকের জন্য ন্যাপি বা বাথরুমের গন্ধ সুখকর মনে হতে পারে। এটা হলো – বর্জ্য মনে হবে খাদ্যের গন্ধের মতো, আর খাদ্যের গন্ধ মনে হবে মানব বর্জ্যের মতো”।

জাস্টিন হাইড

তাহলে পারোসমিয়া কেন হয়

এখন পর্যন্ত যতটুকু জানা যাচ্ছে তাহলো নার্ভের ক্ষতির কারণে মস্তিষ্কের যেখানে গন্ধের সিগন্যাল পৌঁছালে নাকে গন্ধ পাওয়া যায় – সেটি হচ্ছেনা। আবার দুর্ঘটনা বা ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার কারণে পরে অনেক সময় নার্ভ ফাইবার সংযুক্ত হয় ভিন্ন টার্মিনালের সাথে।

“অনেকটা এক জায়গার তার আরেক জায়গায় সংযুক্ত হবার মতো। ফলে মস্তিষ্ক সেটিকে গন্ধ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারেনা”। তবে কতদিন লাগবে এটি ঠিক হতে তা বলতে পারেননি পার্কার – কারণ এ নিয়ে খুব বেশি গবেষণা হয়নি।

তিনি বলছেন স্মেল ট্রেনিং এ বিষয়টায় সহায়তা করতে পারে। যেমন নিয়মিত দরকারি জিনিসগুলোর একটির পর আরেকটিরও গন্ধ নেয়া। ক্লেয়ার ফ্রির সেটি করছেন এবং বলছেন লেবু, ইউক্লিপটাস ও লবঙ্গের অল্প করে গন্ধ তিনি পাচ্ছেন কিন্তু গোলাপের কিছুই বুঝতে পারছেন না।

পারোসমিয়ায় আক্রান্ত কিছু ব্যক্তি তাদের অবস্থাকে সহনীয় করতে একটি ডায়েট ঠিক করে নিয়েছেন। দুই বোন- ক্রিস্টি (২০) ও লরা (১৮) এ পন্থা বেছে নিয়েছেন।তাদের বাবা মা যখন মাছ নিয়ে আসে তখন তাদের দৌড়ে গিয়ে জানালা খুলে দিতে হয়।

“কারণ এর গন্ধ খুবই বিরক্তিকর,” বলছিলেন লরা। “কেউ কেউ বলছিলেন যেকোনভাবে হোক খেয়ে নিতে। আমরা চেষ্টা করি কিন্তু স্বাদ পচা হলে এটা খুব কষ্টের,” বলছিলেন ক্রিস্টি। “এর পরের তিনদিন ধরে ওই গন্ধের সাথেই থাকতে হয়, ফলে সবসময়ই বাজে অনুভূতি ঘিরে থাকে”।

তারা বুঝতে পারছেন যে উদ্ভিজ্জ খাবারের স্বাদ কিছুটা ভালো হয়। “মাংস আমরা এড়িয়ে চলছি। সহজে নিতে পারি এমন রেসিপিগুলো চেষ্টা করছি,” বলছিলেন ক্রিস্টি। “আমরা খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছি এবং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। কারণ হয়তো কয়েক বছর আমাদের এ সমস্যা নিয়েই থাকতে হবে”।

করোনাভাইরাসের গায়ের কাঁটার মত অংশ বা স্পাইকের পরিবর্তন হচ্ছে মিউটেশনের কারণে

জেন পার্কার ও ব্যারি স্মিথ বলছেন, খুব লোকের হলেও এটি প্রায়ই মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ক্লেয়ার ফ্রির তার স্বামীর সাথে কাটানো চমৎকার মূহুর্তগুলো মিস করছেন। তেমনি ৪১ বছর বয়সী জাস্টিন হাইড ২০২০ সালের মার্চে জন্ম নেয়া তার কন্যার কোনো গন্ধই উপভোগ করতে পারেননি।

করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর জুলাই থেকে স্বাদ গন্ধ ফেরত পেতে শুরু করেন তিনি কিন্তু কফির গন্ধটি অদ্ভুত মনে হতে থাকে তার কাছে এবং দ্রুতই এটি বাজে অবস্থায় পরিণত হয়। “প্রায় সব গন্ধই ছিলো এলিয়েনের মতো। বিয়ার, ওয়াইন কোন কিছুই মজা করে খেতে পারছিনা”।

ক্রিস্টি ও লরার মতো তিনিও ভেজিটেবল কারিসহ কিছু মাংসহীন খাবার পেয়েছেন, কিন্তু যতদিন পারোসমিয়া থাকে ততদিন ফ্রাইড ব্রেকফাস্ট চলবেনা। “কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার পর সব আনন্দ হারিয়ে গেছে। নিজেকে ভঙ্গুর মনে হচ্ছে এবং মনে হয় এটি আমি নই”।

What do you think?

DEHO

Written by DEHO

রোগ প্রতিরোধ এবং প্রতিকারের জন্য ওষুধের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে প্রাকৃতিক প্রতিষেধকগুলো সম্পর্কে ধারণা এবং এদের ব্যবহার জানা জরুরী। সঠিক খাদ্য নির্বাচন এবং ব্যায়াম অসুখ বিসুখ থেকে দূরে থাকার মূলমন্ত্র। রোগের প্রতিকার নয়, প্রতিরোধ করা শিখতে হবে। এই সাইটটির উদ্দেশ্য বাংলাভাষায় স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা। তবে তা কোন অবস্থাতেই চিকিৎসকের বিকল্প হিসাবে নয়। রোগ নির্ণয় এবং তার চিকিৎসার জন্য সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

করোনা ভাইরাস ভ্যাকসিন নিয়ে আপনার যত প্রশ্ন ও উত্তর