in

থাইরয়েডের সমস্যায় যত বিপত্তি

ডা. মহিউদ্দিন কাউসার

ক্লান্তি, ওজন বেড়ে যাচ্ছে। সারা দিন ঘুম ঘুম পায়। বিষণ্নবোধ করেন। এসবের জন্য থাইরয়েডগ্রন্থি অনেকাংশে দায়ী। শরীর ও মনের নিয়ন্ত্রক এই গ্রন্থিটি কখনো কখনো শরীরকে গোলমাল করে দেয়। বিশেষ করে নারীদের।

থাইরয়েডগ্রন্থিটি শরীরে বিপাকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর লঘু ক্রিয়া বা ‘হাইপোথাইরয়েডিজম’ রোগে পুরুষের চেয়ে ৫০ গুণ বেশি ভোগেন নারীরা। আছে এই হরমোনটির অতিক্রিয়া বা ‘হাইপারথাইরয়েডিজম’ সমস্যা।

1
2
3

হাইপোথাইরয়েডিজমের সচরাচর কারণ হলো হাশিমটোরস রোগ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক মূলে আছে যে পিটুইটারিগ্রন্থি, এটিতে সমস্যা হলে হতে পারে থাইরয়েডের লঘু ক্রিয়া। এই পিটুইটারি থেকে নিঃসৃত হয় টিএসএইচ, যে হরমোন থাইরয়েডকে কাজ করার নির্দেশ দেয়। পিটুইটারিগ্রন্থি যথেষ্ট টিএসএইচ নিঃসরণ না করলেও থাইরয়েড হরমোনের মান কমে যাবে। আরও অন্যান্য কারণ হলো থাইরয়েড প্রদাহ ও ওষুধপথ্য।

1
5
6

থাইরয়েড অতিক্রিয়া বা হাইপারথাইরয়েটিজমের সবচেয়ে সচরাচর কারণ হলো ‘গ্রেভস ডিজিজ’। শরীর নিজেই নিজের বিরোধী হয়ে ওঠে থাইরয়েডগ্রন্থিকে আক্রমণ করে। এতে প্রচুর থাইরয়েড হরমোন নিঃসৃত হয়। এতে যেসব লক্ষণ দেখা দেয়—

7
9
11

ওজন বৃদ্ধি বা ওজন হারানো

থাইরয়েড বৈকল্যের সবচেয়ে সচরাচর উপসর্গ হলো শরীরের ওজন পরিবর্তন, যার ব্যাখ্যা হঠাৎ পাওয়া যায় না। ওজন খুব বেড়ে গেলে বোঝা যায়, থাইরয়েড হরমোনের মান বেশ কমে এসেছে। অন্যদিকে, থাইরয়েড যদি শরীরের চাহিদার অতিরিক্ত হরমোন নিঃসরণ করতে থাকে, তখন শরীর অপ্রত্যাশিতভাবে ওজন হারাতে থাকে।

7
12
13

গলায় স্ফীতি

গলায় স্ফীতি থাকলে একটি দৃশ্যমান ক্লু থাকল যে থাইরয়েডে কোনো গন্ডগোল আছে। একে বলে গলগণ্ড বা গয়টার। হাইপোথাইরয়েডিজম বা হাইপারথাইরয়েডিজম দুটোর ক্ষেত্রে গলায় স্ফীতি হতে পারে।

হৃৎস্পন্দন হারে পরিবর্তন

এই হরমোন প্রভাব ফেলে হৃৎস্পন্দন হারের ওপরও। যাদের থাইরয়েডগ্রন্থির লঘু ক্রিয়া বা হাইপোথাইরয়েডিজম হয়, তাদের হৃৎস্পন্দন হার স্বাভাবিক থেকে ধীরগতির হয়। আবার থাইরয়েডের অতিক্রিয়া বা হাইপারথাইরয়েডিজম হলে হৃদ্যন্ত্র চলে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুতহারে। বেড়ে যায় র’ক্তচাপ, ধুকপুক বাড়ে হৃদ্যন্ত্রে।

দেহের বলশক্তি ও মনমেজাজে আসে পরিবর্তন

থাইরয়েডযন্ত্র লঘুতালে চললে খুব ক্লান্তি লাগে, শ্লথ হয়ে যায় শরীর, বিষণ্নতা আচ্ছন্ন করে পুরো শরীর ও মনকে। আর থাইরয়েডের ক্রিয়া বেড়ে গেলে উদ্বেগ বাড়ে, ঘুমের সমস্যা হয়, মন হয় অস্থির ও উত্তেজিত।

বাড়ে চুল পড়ার সমস্যা

থাইরয়েড হরমোনের সমস্যায়, চুল পড়া একটি সাধারণ লক্ষণ। হাইপো ও হাইপারথাইরয়েডিজম দুই ক্ষেত্রেই হতে পারে কেশ হানি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে থাইরয়েড সমস্যা দূর করা গেলে আবারও চুল গজানো শুরু হতে পারে।

অতিরিক্ত শীতল বা উষ্ণ অনুভব

থাইরয়েডে সমস্যা হলে দেহের তাপ নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এর ক্রিয়া লঘু হলে শরীরে শীতল বোধ হয় এবং ক্রিয়া অতিরিক্ত হলে প্রতিক্রিয়াটি হয় ঠিক বিপরীত।

এ ছাড়া থাইরয়েডের লঘু ক্রিয়ায় শুষ্ক ত্বক ও ভঙ্গুর নখ, হাতে অবশবোধ ও ঝিনঝিন অনুভূতি, কোষ্টকাঠিন্য ও অস্বাভাবিক ঋতুস্রাব হতে পারে। থাইরয়েডের অতিক্রিয়ায় হতে পারে পেশি দৌর্বল্য বা হাতে কম্পন, দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা, পাতলা পায়খানা ও অনিয়মিত ঋতুস্রাব।

কখন পরীক্ষা করাবেন?

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, থাইরয়েডের কাজকর্ম স্ক্রিনিং শুরু করা উচিত ৩৫ বছর বয়স হলেই। এরপর প্রতি পাঁচ বছরে একবার। এ ক্ষেত্রে অন্তত র’ক্তের টিএসএইচ মান ও প্রয়োজনে টি-৩ ও টি-৪ মান দেখা উচিত।

হাইপোথাইরয়েডিজম চিকিত্সা

রোগ নির্ণয় হলে চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দিতে পারেন। থাইরয়েড হরমোন থাইরক্সিন গ্রহণই এর মূল চিকিৎসা। বেশির ভাগ রোগীকে জীবনভর এই হরমোন গ্রহণ করতে হয়।

হাইপারথাইরয়েডের নানা চিকিত্সা আছে। যেমন অ্যান্টিথাইরয়েড ওষুধ; প্রয়োজনে রেডিও অ্যাকটিভ আয়োডিন, অথবা অপারেশনের মাধ্যমে থাইরয়েড অপসারণ করা। চিকিত্সকই সব দেখেশুনে সিদ্ধান্ত দেবেন।

থাইরয়েড গ্ল্যান্ড সুস্থ রাখার কয়েকটি টিপস:

 উচ্চ মানের টাইরোসিন আমিষযুক্ত খাবার খান। টাইরোসিন দরকার হয় থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে। এটি পেতে খেতে হবে লাল মাংস, মাছ, মুরগির ডিম ও মাংস, কলা ও মিষ্টি কুমড়ার বিচি।

 গয়ট্রোজেনাস খাবার যেমন বাঁধাকপি, ফুলকপি, শিম, চিনাবাদাম, সয়াসস, ইত্যাদি অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া যাবে না। রান্না করে খাবেন, কাঁচা খাবেন না। থাইরয়েডে সমস্যা থাকলে এসব খাবার খাওয়া উচিত নয়।

 গ্লুটেন প্রোটিনযুক্ত খাবার খাবেন, যা রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে ঠিক রাখে। এ জন্য গম, শস্যদানা, যব, বার্লি খেতে হবে।

 থাইরয়েড ঠিক রাখার জন্য লিভারের সুস্থতা দরকার। লিভারের সুস্থতার জন্য ফ্যাটি অ্যাসিডযুক্ত খাবার খেতে হবে। বিভিন্ন তেলযুক্ত মাছ, কাঁচা বাদাম, অলিভওয়েলে এটা পাওয়া যাবে।

 আয়োডিনযুক্ত লবণ খাবেন।

 কীটনাশক ও হেভিমেটাল যেমন মারকারি, ক্যাডমিয়াম, দস্তা ব্যবহারে সতর্ক হবেন।

থাইরয়েডকে ভালো রাখুন, নিজে ভালো থাকুন।

What do you think?

DEHO

Written by DEHO

রোগ প্রতিরোধ এবং প্রতিকারের জন্য ওষুধের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে প্রাকৃতিক প্রতিষেধকগুলো সম্পর্কে ধারণা এবং এদের ব্যবহার জানা জরুরী। সঠিক খাদ্য নির্বাচন এবং ব্যায়াম অসুখ বিসুখ থেকে দূরে থাকার মূলমন্ত্র। রোগের প্রতিকার নয়, প্রতিরোধ করা শিখতে হবে। এই সাইটটির উদ্দেশ্য বাংলাভাষায় স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা। তবে তা কোন অবস্থাতেই চিকিৎসকের বিকল্প হিসাবে নয়। রোগ নির্ণয় এবং তার চিকিৎসার জন্য সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

চোখে ঝাপসা দেখলে কী করবেন!

মানসিক চাপ কমিয়ে ত্বক সুস্থ রাখার কৌশল