in

টিকা নেওয়ার পরপরই কি করোনা হতে পারে?

আব্দুল কাইয়ুম, মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তার সম্পাদক

টিকা নেওয়ার পর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় এবং এরপর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ভয় সাধারণত থাকে না। অ্যান্টিবডির সক্রিয় প্রতিরোধে ভাইরাস সংক্রমণ ঘটাতে পারে না। কিন্তু কিছুদিন আগের একটি ঘটনায় সবাই সচকিত হয়েছিলেন।

ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ডিয়েগোতে ৪৫ বছর বয়সী একজন নার্স ম্যাথিউ ডব্লিউ গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ফাইজারের করোনাভাইস টিকার প্রথম ডোজ নেন। এর ৬ দিন পর ২৪ ডিসেম্বর তিনি অসুস্থবোধ করতে থাকেন। দুদিন পর দেখা গেল তিনি করোনায় আক্রান্ত।

এ খবরে শোরগোল পড়ে যায়। অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দেয়, তাহলে টিকা কি সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য নয়? কিন্তু বিশেষজ্ঞরা পুরো বিষয়টি পরীক্ষা করে বলেছেন, ঘটনাটি ব্যতিক্রমী সন্দেহ নেই, বিশেষ পরিস্থিতির কারণে এ রকম হতে পারে।

ব্যাপার হলো কী, টিকা নেওয়ার পর দেহে রোগ প্রতিরোধীব্যবস্থা সক্রিয় হতে দু-চার দিন সময় লাগে। এর মধ্যে বা টিকা গ্রহণের কয়েক দিন আগেই যদি কোনো ব্যক্তি সংক্রমিত হয়ে থাকেন, তাহলে টিকা কার্যকর হওয়ার আগেই হয়তো তাঁর করোনা হতে পারে। এ বিষয়ে সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় (৩১ ডিসেম্বর ২০২০) ক্যাথরিন জে ওয়াউ বিশ্লেষণমূলক একটি নিবন্ধ লিখেছেন। তিনি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোবায়োলজিতে পিএইচডি করেছেন। নিউইয়র্ক টাইমসে বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য বিষয়ের প্রতিবেদক। তিনি লিখেছেন ফাইজারের টিকা মেসেঞ্জার আরএনএ বা এমআরএনএ অণুভিত্তিক টিকা।

এটা মানব দেহকোষে ঢুকে করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের অনুরূপ প্রোটিন তৈরির নির্দেশ দেয়। এসব নকল স্পাইক প্রোটিনে করোনা হয় না। কিন্তু দেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা তাদের বিরুদ্ধ সক্রিয় হয় এবং সৃষ্ট অ্যান্টিবডি স্পাইক প্রোটিনকে চিনে রাখে। পরে সহজেই করোনার সংক্রমণ রোধ করতে পারে। এই পুরো ব্যবস্থাটি তৈরি হতে কয়েক দিন সময় লাগে। সুতরাং এই সময়ের মধ্যে কারও করোনা হয়ে গেলে সেটা হবে বিরল ঘটনা।

করোনার টিকা নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্পাইক প্রোটিন তৈরি হতে থাকে। কিন্তু আমাদের শরীর সেটা গ্রহণ করে স্পাইক প্রোটিন স্মৃতিতে ধারণ ও সক্রিয় প্রতিরোধ সৃষ্টির জন্য প্রস্তুত হতে কয়েক দিন সময় লাগে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য। ব্যতিক্রম দু–চারটা হয়ে থাকলে সেটা টিকার কারণে হয়নি। টিকা গ্রহণের দু–চার দিন আগে-পরে করোনায় আক্রান্ত হয়ে থাকলে হয়তো কারও ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটতে পারে।

টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা কতটা?

এককথায় উত্তর হলো তেমন আশঙ্কা নেই। যুক্তরাষ্ট্রে মাস দুয়েক আগেও বেশির ভাগ মানুষ করোনার টিকা নিতে তেমন আগ্রহী ছিল না। বলত টিকায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। এ রকম ইতস্তত ভাব অনেক দেশের মানুষের মধ্যেই ছিল বা এখনো রয়েছে। আবার অনেক দেশে এখন তো প্রায় সবাই টিকার জন্য আগ্রহী। আসল ঘটনা কী? টিকার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা কতটা সঠিক?

এসব প্রশ্ন অনেকের মনেই রয়েছে। কারণ, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে ফাইজার ও মডার্নার টিকার অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া হতে দেখা গেছে, যদিও সেটা খুব বিরল এবং সাধারণ চিকিৎসায় প্রায় সবাই সুস্থ হয়ে গেছেন। মেডিকেল নিউজ টুডে-এর নিউজ লেটারে (৭ জানুয়ারি ২০২১) এ বিষয়ে অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞদের মতামত তুলে ধরা হয়। বোস্টনের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটালের বিশেষজ্ঞরা বলছেন টিকায় অ্যালার্জি খুব কমই হয়। এমনকি সাধারণত যাঁদের কিছু খাদ্য বা সাধারণ কিছু ওষুধে অ্যালার্জি থাকে, তাঁরাও অনেকটা নিরাপদ।

তাঁদের গবেষণাপত্র জার্নাল অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ইমিউনোলজি: ইন প্র্যাকটিস-এ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁদের লেখায় টিকার নিরাপত্তা বিষয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছে। তাঁরা বলছেন, ভাইরাস অকার্যকর করতে টিকায় কিছু নিষ্ক্রিয় উপাদান ব্যবহার করা হয়। এই সব উপাদানের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কারও অ্যালার্জি হতে পারে। তাঁদের হিসাবে ১০ লাখ ডোজ টিকায় মাত্র ১.৩টি ক্ষেত্রে এ রকম অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সাধারণ চিকিৎসায়ই সেটা ভালো হয়ে গেছে। যাঁদের এ ধরনের অ্যালার্জির ঝোঁক আছে, তাঁরা ছাড়া অন্য সবাই নিরাপদে টিকা নিতে পারেন বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন।

বাংলাদেশে টিকা পরিস্থিতি

বাংলাদেশে টিকা আসছে। টিকার অগ্রাধিকার অনুযায়ী তালিকা করে দেশের সব জেলা-উপজেলায় টিকা পৌঁছানো এবং তালিকা অনুযায়ী টিকা দেওয়া কঠিন চ্যালেঞ্জ। কিন্তু দায়িত্বশীলভাবে কাজটা করা চাই। সবার জন্য টিকা সংগ্রহ সময়সাপেক্ষ হতে পারে। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালে আমাদের সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে করোনা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এ জন্য বাইরে চলাফেরায় সবার মাস্ক পরা জরুরি। এর কোনো বিকল্প নেই।

What do you think?

DEHO

Written by DEHO

রোগ প্রতিরোধ এবং প্রতিকারের জন্য ওষুধের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে প্রাকৃতিক প্রতিষেধকগুলো সম্পর্কে ধারণা এবং এদের ব্যবহার জানা জরুরী। সঠিক খাদ্য নির্বাচন এবং ব্যায়াম অসুখ বিসুখ থেকে দূরে থাকার মূলমন্ত্র। রোগের প্রতিকার নয়, প্রতিরোধ করা শিখতে হবে। এই সাইটটির উদ্দেশ্য বাংলাভাষায় স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা। তবে তা কোন অবস্থাতেই চিকিৎসকের বিকল্প হিসাবে নয়। রোগ নির্ণয় এবং তার চিকিৎসার জন্য সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

চার খাবারে বাড়ে শরীরে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল

করোনা ভ্যাকসিন: যেভাবে কাজ করবে বাংলাদেশের টিকার অ্যাপ